রোগ ডিরেক্টরি

টাইফয়েড জ্বর কি? কেন হয় এবং হলে করনীয়

টাইফয়েড জ্বর কি? কেন হয় এবং হলে করনীয়

টাইফয়েড বা টাইফয়েড জ্বর (Typhoid fever) একটি সংক্রামক রোগ যা সালমোনেলা টাইফি (Salmonella Typhi) নামক এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমনে হয়। সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। আবার আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলেও এ রোগ হতে পারে। সাধারনত সংক্রমনের ১ থেকে ৩ সপ্তাহ পরে এই রোগের লক্ষন প্রকাশ পায়। এই রোগের প্রধান লক্ষনসমূহের মধ্যে আছে জ্বর, মাথা ব্যথা, বুকের উপর গোলাপি দাগ, লিভার বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, ডাইরিয়া কিংবা কোষ্ঠ্যকাঠিন্য ইত্যাদি।

কিভাবে ছড়ায়

দূষিত খাবার এবং পানির মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। আবার আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শেও এই রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে।

টাইফয়েড জ্বর কেন হয়?

সালমোনেলা টাইফি (Salmonella Typhi) নামক এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমনে টাইফয়েড জ্বর হয়ে থাকে।

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ

সাধারনত টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার এক থেকে তিন সপ্তাহ পর রোগের লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ প্রকাশ পেতে শুরু করে। টাইফয়েডে আক্রান্ত শিশুরা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। নিম্নে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণ বা উপসর্গ বর্ণনা করা হলঃ

  • টাইফয়েড জ্বরের প্রথম দিকে গলা ব্যথা, পেট ব্যথা, মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, শরীর ব্যথা ইত্যাদি অনুভূত হয়।
  • রোগীর শরীরে দুর্বলতা ও অবসাদবোধ কাজ করবে।
  • সাধারণত জ্বর কিছুটা বাড়তে থাকে। ১০৩ থেকে ১০৪ ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।
  • বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
  • ডায়রিয়া কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
  • পেটের ওপরের দিকে বা পিঠে লালচে বা গোলাপি দাগ হতে পারে।
  • রোগ তীব্র হলে মারাত্মক ডায়রিয়া কিংবা তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
  • রোগী প্রলাপ বকতে পারে, এমনকি অচেতনও হয়ে যেতে পারে।
  • শরীরের ওজন দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।
  • অনেক সময় এই জ্বর প্রথম সপ্তাহে ধরা পড়ে না। দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে জ্বর ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
  • অনেক সময় ওষুধ চলা অবস্থায়ও সপ্তাহ খানেক জ্বর থাকতে পারে।

কাদের হতে পারে

  • সাধারনভাবে দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে টাইফয়েড রোগ ছড়ায়। তাই দূষিত পানি বা খাবার খেলে এ রোগ হতে পারে।
  • টাইফয়েড জ্বর ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে, এমন স্থানে ভ্রমণ বা অবস্থান করলে তাদের এ রোগ হতে পারে।
  • হাসপাতালে যারা এ রোগ সনাক্ত বা চিকিৎসার কাজ করেন তাদের হতে পারে।
  • টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে বা তাদের হাতে তৈরী করা খাবার খেলে এ রোগ হতে পারে।
  • আবার শারীরিকভাবে অসুস্থ্য ব্যক্তি বা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে (যেমন- এইচআইভি বা এইডসের চিকিৎসার কারণে) এমন ব্যক্তির টাইফয়েড হতে পারে।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা

চিকিৎসক রোগের ইতিহাস জেনে টাইফয়েড হয়েছে কিনা তা ধারনা করতে পারেন। আবার তিনি প্রয়োজন মনে করলে রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব বা পায়খানা পরীক্ষা এমনকি বোন মেরু পরীক্ষাও করাতে পারেন।

চিকিৎসা

প্রাথমিক অবস্থায় টাইফয়েড ধরা পড়লে এবং চিকিৎসকের পরামর্শমত সঠিক চিকিৎসা গ্রহন করলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো যায়। টাইফয়েড হলে কিছু ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন-

  • রোগীকে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খেতে হবে।
  • পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খেতে হবে।
  • পূর্ণ সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।
  • পানিশূন্যতা দেখা দিলে প্রয়োজনে শিরার মাধ্যমে তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হবে।

টাইফয়েড জ্বর কি? কেন হয় এবং হলে করনীয়

টাইফয়েড জ্বর হলে করনীয়

  • টাইফয়েড সধারনত পানিবাহিত জীবাণুর মাধ্যমে ছড়ায়। তাই টাইফয়েড নির্ণয়ে সবার আগে অসুস্থ ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।
  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করতে হবে।
  • অবশ্যই নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। বাইরের খাবার এবং অপরিষ্কার শাক-সবজি ও কাঁচা-ফলমূল খাওয়া যাবে না।
  • খাওয়ার আগে এবং পায়খানার পরে হাত সাবান দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ঘরের জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা করে রাখতে হবে।
  • স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার করতে হবে এবং টয়লেট সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। টয়লেটে যেন কখনোই ময়লা বা পানি জমে না থাকে, সে ব্যপারে সাবধান হতে হবে।
  • ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে।

টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে করনীয়

পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে, পরিষ্কার পোশাক পরলে এবং নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করলে সহজেই টাইফয়েড প্রতিরোধ করা যেতে পারে। যেমন-

  • হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ঘরের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস আলাদা ভাবে রেখে পরিষ্কার করতে হবে।
  • টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাবার তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে হবে।
  • পানি ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে পান করতে হবে। সবসময় খাবার গরম করে খেতে হবে। বাইরের খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে। অপরিষ্কার শাকসবজি এবং কাচা ফলমূল খাওয়া যাবে না।
  • স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার করতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির টয়লেট সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে।

টাইফয়েড জ্বরে যা হতে পারে

টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে নানান রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- পরিপাকতন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ, হৃৎপিন্ডের মাংসপেশীতে প্রদাহ, কিডনিতে সংক্রমণ, মেরুদন্ডে সংক্রমণ, অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ, পিত্তথলিতে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোড়া, শরীরের ঝিল্লিতে সংক্রমণ ও প্রদাহ, মাথায় ও মেরুদন্ডে রক্ত জমাট বাঁধা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন ধরণের মানসিক সমস্যা যেমন- বিকারগ্রস্থ হওয়া, মস্তিষ্ক বিকৃতিও হতে পারে।

সবশেষে

সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা গেলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন শুরু করা হলে জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ সাধারনত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই কমে যেতে শুরু করে। জ্বর সেরে গেলেও সম্পূর্ণ কোর্স অবশ্যই শেষ করতে হবে। চিকিৎসকেরা সাধারনত টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে টানা ১৪ দিন বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ সেবন বা ইনজেকশন দিতে বলে থাকেন। তাই অবশ্যই জ্বর কমে গেলে বা সুস্থ্য বোধ হলেই ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেয়া যাবে না। সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময় পর্যন্ত ওষুধ সেবন না করলে শরীরে জীবাণু থেকে যেতে পারে এবং পরবর্তীতে আবারও আক্রমণ করতে পারে।

কথায় আছে – রোগ বালাই বলে কয়ে আসে না। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। যেকোনো অসুখ মারাত্মক আকার ধারণ করার আগে নানা ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সেসব উপসর্গকে গুরুত্ব সহকারে দেখি না। ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানো যায় না। অথচ সামান্য একটু সচেতনতাই পারে যেকোনো অসুখ প্রকট আকার ধারণ করার আগে আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে। এ লক্ষে ই হাসপাতাল নিরসল কাজ করে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অসুখের কারণ, লক্ষন ও প্রতিকার নিয়ে সাধারন মানুষকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আপনি চাইলে আপনার কি অসুখ হয়েছে বা হয়ে থাকতে পারে তা আমাদের ব্লগের রোগ ডিরেক্টরি থেকে বের করতেন। অথবা সরাসরি আমাদের কাছে ফোন করতে পারেন এই সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য।

যেকোনো রোগে সময় স্বাস্থ্যসেবা আছে আপনার হাতের কাছেই! ই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ হচ্ছে সকল প্রকার স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসা বিষয়ক সুপরামর্শ প্রদান করা, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দেওয়া, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দুর্লভ ঔষধ সমুহের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে ই হাসপাতাল

জরুরী মুহূর্তে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য অথবা আপনার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার সমাধান পাওয়ার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

ইমেইলঃ support@ehaspatal.com;  ওয়েবসাইটঃ http://ehaspatal.com/