লাইফ স্টাইল

স্থূলতা : স্থূলতার কারণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়

স্থূলতা : স্থূলতার কারণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়

যখন শরীরে অতিরিক্ত পরিমানে স্নেহ বা চর্বি জাতীয় পদার্থ জমা হয়, শরীরের এই বিশেষ অবস্থাকেই স্থূলতা (Obesity) বলে। স্থূলতায় স্বাস্থ্যের ওপর নানান ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে, যেমন- হৃদরোগ, দ্বিতীয় পর্যায়ের ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, অস্টিওআর্থারাইটিস এবং কয়েক ধরনের ক্যান্সার ইত্যাদি। অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, মানসিক অসুস্থতা, বংশ পরম্পরায় জিনগত বৈশিষ্ট্য থেকে প্রাপ্ত গুণাবলী, কিছু হরমোন গ্রন্থির গণ্ডগোল ইত্যাদিকেই মূলত স্থূল বা মোটা হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের যথাক্রমে শতকরা ২০ ভাগ ও ৩০ ভাগের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই স্থূলকায়। গত ২০ বছরে স্থূলতা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩গুণ এবং এই হার অব্যাহত রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহে স্থূলতা বৃদ্ধির হার তুলনামুলকভাবে কম।

BMI বা বডি মাস ইনডেক্স

BMI হলো শরীরের উচ্চতার সাথে ওজনের আনুপাতিক হার, যা দিয়ে বোঝা যায় যে কোনো ব্যক্তি মাত্রাধিক ওজন (pre-obese) বিশিষ্ট কিনা। যদি কারো বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ১৮.৫ kg/m2 এর কম হলে সেটা আণ্ডারওয়েট বা কম ওজন, ১৮.৫ kg/m2 থেকে ২৪.৯ kg/m2 এর মধ্যে হলে ওজন স্বাভাবিক, ২৫ kg/m2 থেকে ২৯.৯ kg/m2 এর মধ্যে হলে তখন তাকে স্থূলকায় বা মোটা বলা যেতে পারে, আর বডি মাস ইনডেক্স বা BMI ৩০ kg/m2 বেশি হলে তখন তাকে অতি স্থূলকায় বা অতিরিক্ত মোটা বলা হয়। নিম্নে বডি মাস ইনডেক্স বা BMI এর একটি চার্ট দেয়া হলঃ

বি এম আই (BMI)

kg/m2

     ওজনের শ্রেণীবিভাগ
< ১৮.৫ আণ্ডারওয়েট বা কম ওজন
১৮.৫—২৪.৯ ওজন স্বাভাবিক
২৫.০—২৯.৯ ওভারওয়েট বা অতিরিক্ত ওজন
৩০.০< অতি স্থূলকায় বা অতিরিক্ত মোটা

স্থূলতা মাপার উপায়

বডি মাস ইনডেক্স’এর সাহায্যেই সাধারণত স্থূলতা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। শরীরের ওজন কেজিতে (Kg) এবং উচ্চতা মিটারে (m) নিয়ে উচ্চতার বর্গ (m2) দ্বারা ওজনকে ভাগ করলেই বডি মাস ইনডেক্স পাওয়া যায়।

পুরুষের কোমরের মাপ ৪০ ইঞ্চি বা তার অধিক হলে এবং স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে ৩৫ ইঞ্চি বা তার অধিক হলে এ রোগের সম্ভাবনা বেশি থাকে। এশীয় পুরুষদের ক্ষেত্রে, কোমরের মাপ ৩৬ ইঞ্চি বা তার বেশি হলে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে, ৩২ ইঞ্চি বা তার বেশি হলে এ রোগে আক্রান্তের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

স্থূলতার কারণ

  • প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার গ্রহনে শরীরে খাবার ব্যয়ের তুলনায় খাবার গ্রহণ বেশি হয় এবং শরীরে বাড়তি এনার্জি যোগ হয় এবং ওজন বাড়ে। অপরদিকে খাবার ব্যয়ের তুলনায় খাবার গ্রহণ কম হলে শরীরের ওজন কমে যায়।
  • জেনেটিক বা বংশগত কারণে স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। যদি বাবা অথবা মায়ের যেকোনো একজনের স্থূলতা থাকে, তাহলে সম্ভাবনা ৪০% এবং যদি উভয়ের স্থূলতা থাকে, তাহলে সম্ভাবনা ৮০%।
  • দীর্ঘদিন ধরে এন্টিডিপ্রেসেন্ট অথবা কর্টিকোস্টেরোয়েড জাতীয় ঔষধ (এরা শরীরে পানি ধরে রাখে) খেলে স্থূলতা  হয়।
  • অপর্যাপ্ত থাইরয়েড ফাংশন, পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম ও কুশিং সিন্ড্রোম হলে শরীরে মেদ জমে। অনেক স্থূলকায় ব্যক্তির রক্তে অভুক্ত অবস্থায় উচ্চ মাত্রার গ্লুকোজ ও ইনসুলিন থাকে।
  • বর্তমানে শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ এবং পরিমান নানা কারনে অনেক কমে গেছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনও রকম শারীরিক পরিশ্রমই হয় না। বিশেষ করে শহরাঞ্ছলে অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন স্থূলতার জন্য দায়ী।
  • উদ্বিগ্নতা, ডিপ্রেশন, ভাবাবেগ, ব্যথা ইত্যাদি হলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাওয়া হয়। এ কারনে স্থূলতা হতে পারে।
  • কোক, পেপসি ইত্যাদি কোমল পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি থাকে। তাই মুটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে অনেক বেশি।
  • অতিরিক্ত এ্যালকোহল পান করলে পাকস্থলীর চারদিকে ওজন বাড়ে।

স্থূলতা : স্থূলতার কারণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়

স্বাস্থ্যের ওপর স্থূলতার ক্ষতিকর প্রভাব

টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদরোগ, অথেরোস্ক্লেরোসিস, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, পালমুনারী ইনসাফিয়েন্সী, আয়ু কমে যাওয়া ইত্যাদি এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে, প্রজনন সমস্যা, মাসিকে অনিয়ম ও বন্ধ্যাত্ব, মানসিক ও যৌন সমস্যা, ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার, পিওথলির ক্যান্সার, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার, অন্ত্র ও প্রস্টেট ক্যান্সার ইত্যাদি হতে পারে। এছাড়াও, সামাজিক সমস্যা যেমন- চাকরিক্ষেত্রে, বিবাহের ক্ষেত্রে সমস্যা ইত্যাদি নানান সমস্যা হতে পারে।

কিভাবে স্থূলতা কমানো যায়?

স্থূলতার ব্যবস্থাপনা অবশ্যই পুষ্টি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে। প্রথমত, খাদ্য গ্রহণ কমাতে হবে। কারন- স্থূলতায় অতিরিক্ত চর্বি শরীরে জমা হয়। খাবার কম গ্রহনের ফলে অতিরিক্ত চর্বি কমে যাবে এবং ধীরে ধীরে ওজন কমে আসবে।

দৈনিক কমপক্ষে ১ ঘন্টা দ্রুত হাটতে হবে। অল্প দূরত্বে কখনোই রিক্সা বা গাড়ি ব্যবহার করা যাবে না। এক স্থানে দীর্ঘসময় বসে থাকা যাবে না।

স্থূলতা : স্থূলতার কারণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও করণীয়

কোনো ব্যক্তির খাদ্য শক্তি নিরূপন করে যদি দেখা যায় তাহার শরীরে ৫ কেজি বেশি ওজন রয়েছে তবে প্রতিদিন ৫০০ কিলোক্যালরি কম খেলে সপ্তাহে ০.৫ কেজি ওজন কমবে অর্থাৎ মাসে ২ কেজি। একইভাবে, প্রতিদিন ২৫০ কিলোক্যালরি খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিলে সপ্তাহে ০.২৫ কেজি অর্থাৎ মাসে এক কেজি পরিমাণ ওজন কমবে।

স্থূলতা প্রতিরোধে করণীয়

  • প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে তাজা ফল এবং শাকসবজি খেতে হবে।
  • দৈনিক কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে।
  • শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
  • ওজন ঠিক রাখার জন্য হিসেব করে যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করা দরকার, শুধুমাত্র তটটুকুই গ্রহন করতে হবে।
  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করতে হবে।
  • প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে।
  • অপরিশোধিত শর্করা ও শাকসবজি খেতে হবে।
  • শিশুদের অবশ্যই চকলেট, কোমল পানীয়, ফলের রস ইত্যাদি খাবার হতে বিরত রাখতে হবে।
  • চর্বি জাতীয় খাবার একেবারেই খাওয়া যাবে না।
  • এ্যালকোহল ও বিয়ার খাওয়া একেবারেই বন্ধ করতে হবে।

গর্ভাবস্থার স্থূলতা

যাঁরা গর্ভাবস্থায় স্থূল নন, তাঁদের চেয়ে যাঁরা স্থূল হয়ে যান তাঁদের সন্তানের অটিজম হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ হতে পারে এবং গর্ভাবস্থায় মায়েরা মোটা হলে এবং সাথে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে ভূমিষ্ঠ শিশুর অটিজমের ঝুঁকি প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। যেহেতু শিশুরা গর্ভাশয়ে থাকার সময় অটিজমের ঝুঁকিতে থাকে তাই, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের সমন্বয়ের বিষয়টা শিশুর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

সবশেষে

গ্রামের চেয়ে শহর এলাকায় স্থূলতা ও অধিক ওজনের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। দেশে প্রতি ৫জন বিবাহিত নারীর মধ্যে ১জন স্থূল অর্থাৎ অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী। আর শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই ধনী পরিবারের নারীরা বাড়তি ওজন ও স্থূল হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। পৃথিবীতে ৩২.৯ শতাংশ মানুষই স্থূলতা রোগে আক্রান্ত এবং ৬৪ শতাংশ মানুষ ভুগছে ওজনাধিক্য রোগে। স্থূলতা এখন আর কোনও সাধারন সমস্যা নয় এটাকে এখন একটি রোগ হিসেবেই দেখা হয়।

স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপন করার জন্য সঠিক লাইফস্টাইল বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। যারা পরিচ্ছন্ন লাইফস্টাইল মেনে চলে তারা স্বাস্থ্যগত অনেক সমস্যা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ পায়। তাই সুস্থ লাইফস্টাইল গড়ে তোলার জন্য ইহাসপাতালের ব্লগটি নিয়মিত পড়ুন। সুস্থ জীবন ধারনের নিত্যনতুন টেকনিক নিয়ে নিয়মিত আমরা পোষ্ট করে যাচ্ছি শুধুমাত্র আপনার উপকারের জন্য। এই সংক্রান্ত যেকোনো জিজ্ঞাসা থাকলে আমাদের ফোন করতে পারেন। আমাদের বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য পরামর্শদাতারা আপনার সাহায্যে সর্বদা নিয়োজিত আছে।

ই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ হচ্ছে সকল প্রকার স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসা বিষয়ক সুপরামর্শ প্রদান করা, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দেওয়া, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দুর্লভ ঔষধ সমুহের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে ই হাসপাতাল।

জরুরী মুহূর্তে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য অথবা আপনার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার সমাধান পাওয়ার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

ইমেইলঃ support@ehaspatal.com;  ওয়েবসাইটঃ http://ehaspatal.com/